রাউজানে নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে স্বাভাবিক থাকার গুজব

0
322
রাউজানে নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে স্বাভাবিক থাকার গুজব
রাউজানে নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে স্বাভাবিক থাকার গুজব

রাউজানে নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে স্বাভাবিক থাকার গুজব

আবু নাছের,বিবিসিনিউজ ডেস্ক  :- রাউজানে ছোটন (২৬) নামে এক ব্যক্তি অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে পুকুরের পানিতে পরিষ্কার করে কিছু অংশ কেটে কবর দেওয়ার পরও নিজে স্বাভাবিক থাকার ঘটনার গুজবে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।  বৃহস্পতিবার উপজেলা পাহাড়তলী ইউনিয়নের উনসত্তর পাড়া গ্রামের শহীদুল্লাহ কাজী বাড়ির বশরত উল্লাহ শাহ (র:) মাজার সংলগ্ন পুকুরে এই ঘটনা ঘটে। গুজব সৃষ্টিকারী ভন্ড ফকির ছোটন উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শফির পুত্র। একইদিন সকালে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে থানা পুলিশ দুই খাদেমসহ ওই প্রতারক কে আটক করেছে।

স্থানীয় প্রত্যেক্ষদর্শী সুত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোরে জনৈক ছোটন শাহ নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ করার লক্ষ্যে উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের উনসত্তর পাড়ার বশরত উল্লাহ শাহ মাজার সংলগ্ন পুকুরে পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে পরিষ্কার করার অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুস ছালাম ও ছোটন শাহার কিছু ভক্ত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চারদিকে গুজব ছড়ায়। এই অলৌকিক ঘটনার গুজব দ্রুত গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ দলে দলে ছুটে আসে। তখন এ অলৌকিকতা দেখে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে টাকা পয়সা দিতে থাকে ওই প্রতারককে।

ঘটনা দেখতে আসা একজন এসকান্দর আলম ও সিরাজুল ইসলাম বলেন, গুজব শুনে সবার মত আমিও ছুটে আসি। এসে দেখি কিছু নাড়ি একটি থালার উপর সাজানো রয়েছে। তার পেটে কোন কাটা বা ক্ষত চিহ্ন দেখা যায় নি। তবে পেটের মধ্যে ব্যান্ডেজ করা ছিল। এসময় ছোটন অসুস্থতার ভান করে একটি চেয়ারে বসে ছিল। তার চারপাশে ভক্তরা ভিড় জমে থাকে এবং টাকা পয়সা দিতে থাকে। সকাল এগারটার দিকে থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়।

রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সৌমেন বড়–য়া বলেন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২ টার দিকে রাউজান থানার পুলিশ মোহাম্মদ ছোটন, প্রকাশ ছোটন শাহ পিতা মোহাম্মদ শফি নামে একব্যাক্তিকে পেটে ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় নিয়ে এলে তাকে নিয়মিত রোগীর তালিকায় অন্তভুক্ত করে (সিরিয়াল নং ৭৭১০) তার ব্যান্ডেজ খুলে দেখি সেখানে কোন কাটা ছেড়া নেই। সে একজন সম্পুর্ণ সুস্থ মানুষ। তার কোন সমস্যা না থাকায় তাকে ভর্তি করে নি।

তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার কারী পুলিশ, এস.আই মুরাদ বলেন একটি গুজবের ঘটনায় চুয়েট ফাঁড়ির পুলিশ মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার সংবাদে ঘটনা স্থলে ফোর্স নিয়ে উপস্থিত হই। গিয়ে দেখি ছোটন তার আস্তানায় বসে আসে। হাজার হাজার লোক জমায়েত রয়েছে।  তার কিছু সাগরেদ তাকে পাখা দিয়ে বাতাস করছেন। তখন সে হালকা অসুস্থতার ভান করে হুক্কা (ধুমপান) টানছেন। তার ভক্তরা এই সময় জানান, তিনি নাকি নিজের পেট কেটে নাড়ি-ভুড়ি বের করে পানিতে পরিষ্কার করে কবর দিয়ে সুস্থ অবস্থায় আস্তানায় বসে আছেন। লোকজন ভিড় করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। এবং সম্মুখে থাকা বালতিতে লোকজন টাকা পয়সা দিচ্ছেন। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান সে সম্পুর্ণ সুস্থ। তার শরীরে কোথাও কোন আঘাত নেই। তিনি আরো জানান, সে নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রকাশ করে প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তার ভক্তদের মাধ্যমে এই গুজব রটিয়েছেন।

গুজব সৃষ্টিকারীদের অন্যতম মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুস ছালামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ভোরে মসজিদে গেলে দেখি একটি ছুরি হাতে মসজিদের পাশে দাড়িয়ে আছে। তার শরীরের কিছু রক্ত দেখা গিয়েছিল। এসময় তাকে ঘটনার কারণ কি জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, প্রখ্যাত সাধক আশরাফ শাহ (র:) তাকে ছুরি মেরেছে। এছাড়া তিনি নাড়ি ভুড়ি কিছু দেখিনি বলে জানান।

পুলিশের হাতে আটক ভন্ড ফকির ছোটন শাহ বলেন, আমি যখন ধ্যানে থাকি তখন ব্লেড, মাটি, গাছ খেতে সক্ষম হই। আমি ধ্যানে থাকার সময় কি হয়েছে তা বলতে পারিনা। নাড়ি-ভুড়ি কবর দেওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, অলৌকিক অবস্থায় কি হয় তা প্রকাশ করা যায়না। পেটে ব্যান্ডেজ সম্পর্কে বলেন, তার পেটে রক্ত দেখে ভক্তরা কিছু ক্ষতি হবে মনে করে ব্যান্ডেজ করিয়ে দেয়।

তার ভক্ত কদলপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য রাশেদা আকতার ও তার স্বামী মো. ইসহাক বলেন, গত দুই মাস পূর্বে তার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়–য়া মেয়ে আকলিমা আকতার বাকপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়লে বাবার (প্রতারক ছোটন) কাছে নিয়ে গেলে ঝাড়-ফুঁক করে সুস্থ করে তুলেন। কিন্তু রাশেদার পাশের বাড়ির নাম প্রকাশে অনিশ্চুক এক যুবক বলেন, তার মেয়ে কখনও বাকপ্রতিবন্ধী ছিল না।

কদলপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান কমল চক্রবর্তী বলেন, গত বুধবার রাত দুইটার দিকে সমশের পাড়া এলাকায় মেয়ে সংক্রান্ত ঘটনায় স্থানীয় কিছু ছেলে তাকে তাড়া করেছিল। সে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে ছাগল বা মুরগি নাড়ি-ভুড়ি পেটে গামছা দিয়ে বেঁধে অলৌকিক ঘটনার গুজব ছড়িয়ে ছিল।

এ ঘটনায় প্রখ্যাত সাধক হযরত আশরাফ শাহ (র:) এর মাজারের খাদেমগণ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে পাঁচ টায় ছোটনের বিরুদ্ধে রাউজান থানায় লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, ভন্ড ছোটন আশরাফ শাহার গায়েবী খেলাফত পেয়েছে বলে প্রচারণা চালিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অপকর্ম করে আসছিল। তারা ভন্ড ছোটনের শাস্তির দাবী জানান। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছোটন শাহ স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। সে পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করত। বিগত পাঁচ বছর ধরে অলৌকিক ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েছে বলে প্রচার করে নিজের বাড়ির পাশে আস্তানা গড়ে তুলে সর্বরোগের চিকিৎসা করার নামে হাজার হাজার নারী পুরুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নিত্য দিন।