বাঁশখালীতে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ৫

0
170

বাঁশখালী প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে উপকূলীয় গণ্ডামারা এলাকায় সোমবার কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের ভয়াবহ সংঘর্ষে দুই সহোদর ও এক নারীসহ অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন বাঁশখালী থানার ওসিসহ শতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশংকাজনক। তবে স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করছেন, এ ঘটনায় অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। আরও দু’জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

১৪৪ ধারা ভেঙে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পবিরোধী লোকজন সমাবেশ করতে চাইলে পুলিশ জনতার ওপর গুলি ছোড়ে। এতে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ঘণ্টাব্যাপী চলা এ সংঘর্ষে পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

গুলিতে নিহতরা হলেন- গণ্ডামারা গ্রামের আশরাফ আলীর ছেলে মরতুজা আলী (৫২), তার ভাই আংকুর আলী (৪৫),মোজাহের আলম সিকদারের ছেলে জাকের আহমদ (৩৫), আবুল খায়েরের ছেলে জহির উদ্দিন (৪৫) ও অজ্ঞাত পরিচয় এক নারী।

গত রাত সাড়ে ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাশগুলো ঘটনাস্থলে পড়েছিল। হতাহতদের স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে চলছিল আহাজারি।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন, আহতদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার সময় প্রকল্পের লোকজন ও পুলিশ বাধা দেয়।

ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা সৃষ্ট ঘটনার জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, জায়গা-জমি নিয়ে প্রতারিত স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কয়লাবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের নানা বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলেও এতে আওয়ামী লীগ জড়িয়ে যায়। যে কারণে পরিস্থিতি এত বড় আকার ধারণ করে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গণ্ডামারায় বৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে এস আলম গ্রুপ। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে শুরু থেকেই এলাকাবাসীর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের মতবিরোধ ছিল। বাড়ি-ভিটি থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দিরের জায়গাও প্রকল্পে ঢোকানো হচ্ছিল।

তাছাড়া জমির দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি কয়লাবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে প্রকৃত তথ্য না দিয়ে একের জমি অন্যজনের কাছ থেকে কিনে নেয়া, সঠিক দর না দেয়া, প্রকৃত ক্রেতা তথা এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেয়াসহ অনেক কিছুই আড়াল করছিল।

প্রায় ২ বছর ধরে এলাকাবাসী তথা প্রকৃত ভূমি মালিকরা এসব নিয়ে ফুঁসছিল। তারা কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে না হলেও এ প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষকে নানাভাবে প্রতারিত করার বিরুদ্ধে ফুঁসতে থাকেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রকল্পে কর্মরত লোকজনের সংঘর্ষ ও হামলা-পাল্টাহামলা হয়।

সূত্র জানায়, শনিবার প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ভাই শহীদুল আলম। সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও সেখানে যান। এ সময় স্থানীয়রা তাদের গাড়িবহরে হামলা করেন। দুটি বেবিট্যাক্সি ভাংচুর ও তিনটি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেন তারা। এ নিয়ে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। রোববার রাতেই হামলাকারী সন্দেহে সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

তাদের মুক্তির দাবিতে সোমবার বিকালে ‘বসতভিটা রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে গণ্ডামারা এলাকায় সমাবেশ আহ্বান করে এলাকাবাসী। অন্যদিকে একই এলাকার হাজীগাঁও স্কুল মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও কয়লাবিদ্যুতের পক্ষে শান্তি সমাবেশের ডাক দেয়া হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল আলম এ সমাবেশের ডাক দেন। পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকার কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় অধিবাসী আবদুর রহমান, আবুল বশর ও আলী নবীর জানান, স্থানীয় লোকজন তাদের ভিটামাটি রক্ষায় আহূত সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ বিনা উসকানিতে নিরস্ত্র জনতার ওপর পাখির মতো গুলি চালিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীরাও গুলি করেছে। আহতদের বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিতেও পুলিশ ও কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের লোকজন নানাভাবে বাধা দেয়।

তারা আরও বলন, স্থানীয় লোকজন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে নয়। প্রকল্পের জায়গার বেচাকেনা নিয়ে যারা মধ্যস্থতার নামে ভূমি মালিকদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন, গরিব লোকজনকে ঠকাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেই ছিল এলাকাবাসীর অবস্থান। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সমাবেশের ডাক দেয়ার কারণে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। যদি আওয়ামী লীগ এ সমাবেশের ডাক না দিত ১৪৪ ধারা জারি হতো না। সে ক্ষেত্রে ১৪৪ ধারা ভঙ্গেরও প্রশ্ন উঠত না। স্থানীয় এমপি মোস্তাফিজুর রহমানও এ ঘটনার দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

বাঁশখালী থানার ওসি স্বপন কুমার মজুমদার বলেন, ১৪৪ ধারা জারি থাকায় পুলিশ স্বাভাবিকভাবেই সমাবেশ করতে বাধা দেয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজন বাধা উপেক্ষা করে পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল, এমনকি গুলিও ছোড়ে। এ কারণে পুলিশও পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়। তবে পুলিশ কত রাউন্ড গুলি চালিয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি ওসি। হামলায় ওসি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। তিনি ছাড়াও এসআই বেলাল উদ্দিন, কনস্টেবল খোরশেদ আলম, কনক বড়ুয়া ও আনসার সদস্য মোতালেব গুলিবিদ্ধ হন।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের স্থান নির্বাচন ও জমি ক্রয়ে নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাঁশখালীতে আন্দোলন করে আসছিলেন। তারা জনবসতিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রকল্পের জমি কেনার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে চলার জন্যও কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্নভাবে বার্তা দেন। সম্প্রতি এ নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।

২৩ মার্চ পুলিশের উদ্যোগে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, ইউএনও শামসুজ্জামান ও ওসি স্বপন কুমার মজুমদারের উপস্থিতিতে গন্ডামারা ইউনিয়নের সকাল বাজারে শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেয়। ওই সমাবেশ থেকে স্থানীয় জনগণ বাঁশখালীর লোকালয় বাদ দিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের দাবি জানায়।

তারা এ বিষয়ে উপস্থিত লোকজনকে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু শনিবার কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের লোকজনের ওপর হামলা, পরে মামলা ও সাতজনকে গ্রেফতার পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। তা আরও জটিল করে আওয়ামী লীগের ডাকা সমাবেশ।

এলাকাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান সন্ধ্যায় বলেন, এ ঘটনায় আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কোনো দায়ও নেই। আওয়ামী লীগ কেন সমাবেশ ডেকেছে, আমি জানি না।

এস আলম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ও কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সুব্রত ভৌমিক সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, পুরো এলাকার মানুষ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হোক এটা চায়। কিন্তু স্থানীয় কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ নানা অজুহাতে বাধা দিচ্ছে। জমি ক্রয় নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ নেই। চাহিদা অনুযায়ী এবং বাজারমূল্য দিয়েই প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে জায়গা কেনা হচ্ছে। ৭৫ শতাংশ চীনা ও বাকি ২৫ শতাংশ এস আলমের বিনিয়োগে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের সর্ববৃহৎ এ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প।

এক মাস আগে থেকে প্রকল্প কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। সুযোগসন্ধানী চাঁদাবাজ গ্রুপটি কিছু লোকজনকে ভিড়িয়ে প্রকল্পের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। প্রকল্প কাজে নিয়োজিত লোকজনের ওপর হামলা করছে। মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। মূলত তারাই সোমবার পুলিশের ওপর হামলা করলে পুলিশ গুলি করতে বাধ্য হয়।

বিরোধের আরও যেসব কারন‌,আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছাএ ইউনিয়ন নেতা সোহেল উদ্দিন বলেন, বাঁশখালীর গন্ডামারা-বড়ঘোনায় ৭ হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি রয়েছে। এছাড়াও ৭০টি মসজিদ, মক্তব, কবরস্থান, কয়েকটি শ্মশান, একটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, একটি উচ্চবিদ্যালয়, ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি আলিয়া মাদ্রাসা, ৫টি বাজার, একটি মিনি সমুদ্রবন্দর, ৫টি কওমি মাদ্রাসা, ২০টি ছোটবড় আশ্রয় কেন্দ্র ও একটি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এরপরও মাত্র ১৫০টি বসতবাড়ি দেখিয়ে বড়ঘোনা-গন্ডামারা মৌজার বিপুল পরিমাণ জমি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য খরিদ করার অনুমতি দিতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের যোগসাজশে উপজেলা ভূমি অফিস জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। তাদের প্রতিবেদন সব কিছুকে গোপন রাখা হয়। ইতিমধ্যে ওই প্রকল্পের জন্য ৬৬০ একর জমি কেনা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে মাত্র ১৫০টি বসতবাড়িকে পুনর্বাসনের প্রস্তাবও করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ২ বছর ধরে গন্ডামারা-বড়ঘোনা এলাকায় জমি কেনা হচ্ছে। শুরুতে বন্দর করার নামে জায়গা কেনা হলেও এখন তারা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করতে উদ্যোগ নিয়েছে। তাছাড়া জমির মালিকরা জমির প্রকৃত মূল্য পায়নি। তারা প্রকল্পের নিয়োজিত বিভিন্ন দালালদের হাতে প্রতারিত হয়েছে। বাঁশখালীর এ বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধেও নানামুখী বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

সরকারদলীয় নেতাদের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে এ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফায়দা নিয়েছে। কিন্তু জনগণকে পুনর্বাসন বা তাদের বঞ্চনার বিষয়টি তারা আমলে নেয়নি।