“এ যেন ভ্রাম্যমান বোমা” খুলনায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস!

0
107
"এ যেন ভ্রাম্যমান বোমা" খুলনায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস! BBCNEWS24

“এ যেন ভ্রাম্যমান বোমা” খুলনায়

অবাধে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ- খুলনা মহানগরী ও তার আশপাশ এলাকার ফুটপাথসহ যত্রতত্র চলছে এলপি গ্যাসের খুচরা ব্যবসা। অধিকাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ফুটপাথে বিক্রি এবং গাড়িতে বহন করায় যেকোনো সময় গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন পথচারীসহ আশপাশের সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮টির কম গ্যাস সিলিন্ডার রাখলে লাইসেন্স প্রয়োজন হবে না, এমন আইনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নগরীর অধিকাংশ এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী লাইসেন্স না নিয়েই অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন। আবার যাদের বিস্ফোরক অধিদফতরের লাইসেন্স আছে, তাদের নেই প্রাথমিক বিপর্যয়ে রক্ষায় ড্রাই পাউডার ও সিও ২ সরঞ্জাম। আর ৮টির বেশি গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করতে হলে নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক হলেও তা মানছেন না এসব ব্যবসায়ীরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চায়ের দোকান, মুদি, ক্রোকারিজ ও কসমেটিকস দোকান মালিকরা পর্যন্ত খোলামেলা অবস্থায় গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি ও ব্যবহার করে আসছেন। এছাড়া ওইসব দোকানে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডার রাখার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ দোকানেরই তা নেই। আবার কয়েকটি দোকানে এ গ্যাস সিলিন্ডার থাকলেও তার বেশিরভাগই মেয়াদ উত্তীর্ণ। অথচ নিয়ম অনুযায়ী এলপি গ্যাস ব্যবহার, বিপনন ও বাজারজাত করতে হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীকে বিস্ফোরক অধিদফতরের লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপক গ্যাস সিলিন্ডার বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ করার কথা।

খুলনার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদ ছাড়াই স্থানভেদে ২০ থেকে শুরু করে শতাধিক এলপি গ্যাস সিলিন্ডার দোকানে মজুদ করেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এসব দোকানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলপি গ্যাসবোঝাই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে।

সরেজমিনে নগরীর বড় বাজার, শিববাড়ি, সোনাডাঙ্গা, বয়রা, খালিশপুর, দৌলতপুরে দেখা মেলে খুচরা এলপি গ্যাস বিক্রি চলছে দেদারছে। সংশ্লিষ্টরা আইন না মেনেই এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এ জ্বালানি গ্যাসের ব্যবসায় নেই কোন অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা। খুচরা এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশিরভাগই আইনগত বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অবগত। তার পরও তদারকির অভাবে ঝুঁকি জেনেও তারা লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবসা করছেন। লাইসেন্স না নেওয়ার ভয়ে অনেকে দোকানের সামনে মাত্র ৫-৬ টা সিলিন্ডার রেখে দেয় কিন্তু দেখা যায় ২০-৩০টিরও বেশি সিলিন্ডার গাড়িতে নামে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী বলেন, লাইসেন্স করতে এতো টাকা খরচ করে লাভ কী? এ টাকা খরচ না করে বেশি বেশি বোতল কেনা যায়। তাছাড়া এখন অনেকেই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেয় না। ৮টির কম দেখালেই হয়ে যায়। তাই আমরাও নিই না। সরকার চাপ দিলে যখন সবাই নিবে, তখন আমরাও নিব।

দেশে সাধারণত উৎপাদনকারীর কারখানা থেকে ডিলার হয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে এলপি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার পৌঁছায়। এক্ষেত্রে উৎপাদনকারীরা ডিলারদের কাছে সিলিন্ডার সরবরাহের ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদের বিষয়টি যাচাই করে থাকেন। কিন্তু সরবরাহ চেইনে সাধারণত এর পর আর তদারকি হয় না। যদিও আইন অনুযায়ী ৮টির বেশি এলপি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার বা গ্যাসাধার রাখলে যেকোনো ব্যবসায়ীর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক।

বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪-এর ‘দ্য এলপি গ্যাস রুলস ২০০৪’-এর ৬৯ ধারার ২ বিধিতে ‘লাইসেন্স ব্যতীত কোনো ক্ষেত্রে এলপিজি মজুদ করা যাবে’ তা উল্যেখ আছে। বিধি অনুযায়ী, ‘০৮ (আটটি) গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদকরণে লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই’। অর্থাৎ ০৮টির বেশি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদের ক্ষেত্রে লাইসেন্স নিতে হবে। একই বিধির ৭১ নং ধারায় বলা আছে, আগুন নিভানোর জন্য স্থাপনা বা মজুদাগারে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুদ রাখিতে হইবে। এ আইন অমান্য করলে যে কোনো ব্যবসায়ী অন্যুন দুই বছর এবং অনধিক পাঁচ বছরের জেল এবং অনধিক ৫০ হাজার টাকায় দন্ডিত হবেন এবং অর্থ অনাদায়ী থাকলে অতিরিক্ত আরো ছয় মাস পর্যন্ত কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে পরিচালিত বিস্ফোরক অধিদপ্তর এলপিজি বা এলপিজি ব্যতীত গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার অধিকারে রাখার জন্য লাইসেন্স প্রদান করে থাকে।

এ বিষয়ে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিস্ফোরক পরিদর্শক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগে যেখানে ১০টি ছিল সেখানে আমরা অভিযোগ করেছিলাম ১০টি নয়, একটিতেও ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। সুতরাং সকল এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীর জন্য লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা হোক। তবে কমিয়ে নতুন আইনে ৮টির বেশি এলপি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার রাখলে যেকোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নিতে হবে। তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা সম্পূর্ণ বেআইনি, তবে অনেকেই তা মানছে না। এটা সত্য যে নগরির অধিকাংশ গ্যাসের দোকানে প্রাথমিক নিরাপত্তার জন্য সিও২ ও ড্রাই পাউডার নেই। আমি নিজে বিভিন্ন সময় ছদ্মবেশে নগরিতে ঘুরে বেড়াই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে খুলনা-বরিশাল মিলিয়ে ১৬ জেলায় আমিই একমাত্র প্রথম সারির কর্মকর্তা হওয়ায় সব সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না।

এছাড়া তিনি বলেন, আমার অফিসে কেউ অনৈতিক লেনদেন করে এমন অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তবে আমাদের জনবল কম থাকায় ইচ্ছা থাকলেও কিছু করার থাকে না। বর্তমানে মোংলাবন্দর এর কার্যালয়ে ভাড়ার বাবদ বিস্ফোরক অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অফিস পরিচালনা হচ্ছে। নেই নিজেস্ব ভবন এবং যাতায়েত বা পরিদর্শনের জন্য অফিসিয়াল যানবাহন। খুলনা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সূত্রমতে জেলায় লাইসেন্স বলবত আছে ৫০০টি, আর প্রস্তাবিত আছে ৮০টি।

ব্যবসায়ীদের আইন অবমাননার ঝুঁকি প্রসঙ্গে খুলনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর ইন্সপেক্টর সঞ্জয় কুমার রায় বলেন, এলপি গ্যাস এক ধরনের দাহ্য পদার্থ। যেখানে সেখানে যত্রতত্র ভাবে বহন করা যাবে না। তা না হলে সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হয়ে যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। ১টি বা ৮টি নয় গ্যাস বিক্রির জন্য যে সকল দোকান রয়েছে, তার প্রতিটিতে প্রয়োজন মত ড্রাই পাউডার ও সিও২ রাখতে হবে।

সাধারণ ব্যবসায়ী নুরুল আমীন ও পথচারি রফিক, নরোত্তম, সুমন প্রতিবেদককে বলেন, আমরা সব সময় ভয়ে থাকি কখন বিস্ফোরণ ঘটে। এমন কি ট্যাংলরিতে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেলের গাড়িতেও বহন করছে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। ফুটপথে যেখানে সেখানে বসছে গ্যাসের ব্যবসা। মনে হয় দেখার কেউ নেই। তাদের প্রশ্ন, বিস্ফোরক আইনে বলা আছে ৮টির কম হলে লাইসেন্স লাগবেনা, তবে কি ৮টির কম হলে বিস্ফোরণও ঘটবে না, বেশি হলে ঘটবে।